তুমি ডানা মেলো | Tumi Dana Melo | Chapter 05 | A tragic love story of a medical representative and a doctor by Tanmoy Roy | Cholo Golpo Suni


 
********************
AT FIRST PLEASE READ CHAPTER 01, CHAPTER 02, CHAPTER 03 & CHAPTER 04
********************

কুঞ্জবনের সেই ভাড়াবাড়ির ঘরে সেদিন এক অদ্ভুত শান্ত বাতাস বইছিল। বিকেলের ম্লান আলোটা জানলা গলে এসে পড়েছিল সাগরের বিছানায়। ও আজ অনেকদিন পর কষ্ট করে হলেও নিজে উঠে জানলার পাশের চেয়ারটায় এসে বসেছিল। ওর শরীরটা এখন বড্ড বেশি জীর্ণ, কঙ্কালসার; কিন্তু ওর সেই শান্ত চোখের গভীরতাটা আজ এক্কেবারে প্রথম দিনের ওপিডি করিডোরের মতোই স্বচ্ছ লাগছিল।

সন্ধের মুখে দীপান্বিতা যখন হাসপাতাল থেকে ফিরল, ওর চোখে-মুখে সেই চেনা ডিউটির ক্লান্তি আর একরাশ অপরাধবোধের ছায়া। প্রতিদিন একটা মরোমরো মানুষের কেয়ারগিভিং করা, চারদিকের সামাজিক ট্রোলিং আর নিজের অবচেতন মনে জন্ম নেওয়া নতুন আশ্রয়ের টান—সব মিলিয়ে ও ভেতর থেকে এক্কেবারে শেষ হয়ে গিয়েছিল। ব্যাগটা টেবিলে রেখে ও আজ আর ওষুধের ফাইলের দিকে হাত বাড়াল না। ও চুপচাপ এসে সাগরের সামনের খালি টুলটায় বসল।

ওর হাত দুটো নিজের অজান্তেই কাঁপছিল। ও নিজের চোখের জল আর ভেতরের তীব্র ফ্রাস্ট্রেশনটা আর চেপে রাখতে পারছিল না। সাগরের শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে আজ প্রথমবার ও নিজের ডাক্তারী মুখোশটা পুরোপুরি খুলে ফেলল।

"সাগর..." দীপান্বিতার গলাটা এক তীব্র কান্নায় বুজে এল, "আমি আর পারছি না... আমি সত্যিই আর পারছি না।"

সাগর একটুও অবাক হলো না। ও নিজের ফ্যাকাসে হাতটা বাড়িয়ে দীপান্বিতার কাঁপতে থাকা হাতটার ওপর রাখল। ওর হাতের স্পর্শটা আজ বড্ড বেশি হালকা ছিল। ও স্রেফ শান্ত চোখে চেয়ে রইল, যেন ও জানত আজ এই দিনটা আসবারই ছিল।

"কী হয়েছে দীপু? বলো।" সাগর খুব নরম গলায় বলল।

"আমি একটা স্বার্থপর মেয়ে, সাগর! তুমি আমাকে ক্ষমা করে দিও।" দীপান্বিতা ফুঁপিয়ে কেঁদে উঠল, ওর চোখের জল সাগরের ফ্যাকাসে হাতের ওপর এসে পড়ল। "আমি ভেবেছিলাম সব দেওয়াল ভেঙে আমি তোমার পাশে থাকতে পারব। কিন্তু এই বন্ধ ঘরের থমথমে নীরবতা, হাসপাতালের ওই বিষাক্ত ট্রোলিং, আর প্রতিদিন তোমাকে এভাবে তিলে তিলে শেষ হতে দেখা... আমার মেন্টাল ব্যালেন্স পুরো নষ্ট করে দিচ্ছে। আমার নিজের অবচেতন মনটাও আজ আর আমার নিয়ন্ত্রণে নেই... ও অন্য কোথাও শান্তি খুঁজছে। আমি ডিউটি থেকে এই ঘরে ফিরতে ভয় পাই, সাগর! আমি এক চরম গিল্ট ট্রিপে প্রতিদিন মরছি।"

দীপান্বিতা সাগরের চোখের দিকে তাকাল। ওর সেই মায়াবী চোখ দুটো আজ প্রথমবার এক তীব্র অসহায়তা আর মুক্তির আকুতিতে কাঁপছিল।

"আমি তোমার ট্রিটমেন্টের কোনো খামতি রাখব না, সাগর। তোমার ওষুধের খরচ, ডাক্তারের অ্যাপয়েন্টমেন্ট—সব আমি আগের মতোই সামলাব। কিন্তু প্রেমিক সেজে এই এক ছাদের নিচে থাকার অভিনয়টা আমি আর করতে পারছি না। এই সম্পর্কটা আমার দম আটকে দিচ্ছে। সাগর... আমাকে এই সম্পর্ক থেকে একটু মুক্তি দেবে? আমরা কি... আমরা কি এখানেই আলাদা হয়ে যেতে পারি না?"

নিজের ভালোবাসার মানুষের মুখ থেকে এই চরম রূঢ় সত্যিটা শোনার পর সাগরের বুকের ভেতরটা হয়তো এক লহমায় চুরমার হয়ে গেল, কিন্তু ও নিজের চোখে এক ফোঁটাও জল আসতে দিল না। ও বোকা ছিল না, ও সবটাই বুঝত। ও জানত, ভালোবাসা আর কর্তব্য এক জিনিস নয়।

সাগর একটু হাসল—সেই প্রথম দিনের মতো চেনা, নিরহংকার আর মায়াবী হাসি। ও নিজের হাতটা আলতো করে দীপান্বিতার হাত থেকে সরিয়ে নিল। এটা কোনো অভিমানের সরিয়ে নেওয়া ছিল না, এ ছিল এক চরম বুকফাটা ভালোবাসার সম্মতি।

"তুমি নিজেকে স্বার্থপর বলছ কেন, দীপু?" সাগর খুব শান্ত গলায় বলল, "তুমি আমার জন্য যা করেছ, তা এই দুনিয়ায় কেউ কারও জন্য করে না। নিজের পুরো লাইফটা বাজি রেখে তুমি এই চাকরিহীন মরোমরো রোগীকে আশ্রয় দিয়েছ। কিন্তু আমি তো একাকী বাজপাখি, আমার ডানা অনেক আগেই ভেঙে গেছে। আমার এই অন্ধকার ক্যানসারের ঘরে বন্দি রেখে আমি তোমার সুন্দর জীবনটাকে এভাবে প্রতিদিন শেষ হতে দিতে পারি না।"

সাগর দীপান্বিতার চোখের দিকে তাকিয়ে পরম শান্তিতে বলতে লাগল, "তুমি ব্রেকআপের কথা বলে কোনো পাপ করোনি, দীপু। তুমি স্রেফ কঠিন বাস্তবটা নিজের মুখে স্বীকার করেছ। আজ কোনো চিৎকার নেই, কোনো ঝগড়া নেই, কোনো ব্লেম গেম নেই... স্রেফ দুটো ম্যাচিউরড মানুষের মতো আমি তোমার এই সিদ্ধান্তটাকে হাসিমুখে মেনে নিলাম। আমি তোমাকে চিরতরে মুক্তি দিলাম, দীপু। তুমি কালই তোমার সরকারি কোয়ার্টারে ফিরে যাও। আর আমাকে আমার মা-বাবার কাছে গ্রামের বাড়িতে ফিরে যেতে দাও। এটাই আমাদের জন্য সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ আর সুন্দর পরিণতি।"

দীপান্বিতা সাগরের দিকে তাকাল। সাগরের এই দেবতাতুল্য ম্যাচিউরিটি আর নিঃশর্ত ভালোবাসা দেখে ওর মনের ভেতরের এতদিনের চেনা অপরাধবোধের পাথরটা এক মুহূর্তে গলে জল হয়ে গেল। ও বুঝতে পারল, সাগর ওকে কতটা গভীরভাবে ভালোবাসলে এতটা সহজে হাসিমুখে মুক্তি দিতে পারে। কোনো চিৎকার-চেঁচামেচি হলো না, কোনো বাড়তি কথা হলো না। দীপান্বিতা কেবল সাগরের পায়ের কাছে মাথাটা রেখে কয়েক সেকেন্ড নিঃশব্দে কাঁদল।

কুঞ্জবনের সেই ভাড়াবাড়ির বারান্দায় যখন রাতের অন্ধকার নামল, তখন ঘরের দুটো মানুষ আর প্রেমিক-প্রেমিকা ছিল না; তারা হয়ে উঠেছিল জীবনের সবচেয়ে কঠিন বাস্তবকে হাসিমুখে মেনে নেওয়া দুটো ম্যাচিউরড সত্তা। ওপিডি করিডোরের সেই চেনা চোখের মায়া আজ দীপান্বিতার নিজের চাওয়া এক নিটোল, শান্ত আর বুকফাটা মুক্তির মাধ্যমে এক চরম ভারসাম্যপূর্ণ ব্রেকআপের ট্র্যাজেডিতে গিয়ে শেষ হলো।


 ********************


কুঞ্জবনের সেই ভাড়াবাড়িটা ছেড়ে দীপান্বিতা যেদিন নিজের সরকারি কোয়ার্টারে ফিরে গেল, সেদিনই সাগরও নিজের ভাঙা সুটকেসটা গুছিয়ে গ্রামের বাড়ির উদ্দেশ্যে রওনা দিয়েছিল। কিন্তু নিয়তির নিষ্ঠুর খেলা তখনও বাকি ছিল। গ্রামে যাওয়ার কয়েকদিনের মাথাতেই সাগরের শারীরিক অবস্থার মারাত্মক অবনতি ঘটে। অনবরত রক্তবমি আর শ্বাসকষ্টের কারণে বাড়ির লোক বাধ্য হয়ে ওকে আবার ফিরিয়ে আনে এবং আগরতলা ক্যানসার হাসপাতালে ভর্তি করায়।

হাসপাতালের চার দেওয়ালের চেনা সাদা আলো আর স্যালাইনের বোতলের টিকটিক শব্দের মাঝেই সাগরের দিনগুলো কাটছিল। এর মাঝেই একদিন ক্যানসার ওয়ার্ডের সেই নিরিবিলি কেবিনে পা রাখল দীপান্বিতা। ওর বিয়ের তখন আর মাত্র দুটো সপ্তাহ বাকি। সেই সিনিয়র রেসিডেন্ট ডাক্তার, যে এই কঠিন সময়ে ওর পাশে ছায়ার মতো দাঁড়িয়েছিল—ওর সাথেই দীপান্বিতার বিয়ে ঠিক হয়েছে। দীপান্বিতা সেদিন সাগরের বিছানার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিল। ওদের মধ্যে আর কোনো বাড়তি কথা হয়নি, কোনো পুরোনো আবেগের বিস্ফোরণ ঘটেনি। ও স্রেফ দূর থেকে শান্ত চোখে সাগরকে শেষবারের মতো দেখতে এসেছিল। সাগরও ওর চোখের দিকে তাকিয়ে আলতো করে হেসেছিল—যেন এক নীরব বিদায়বার্তা আদান-প্রদান হয়ে গিয়েছিল দু-জনের মধ্যে।

তারপর এল সেই অভিশপ্ত রাত।

হাসপাতালের বেডে শুয়ে শুয়ে সাগরের শরীরটা তখন যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাচ্ছিল। ও নিজের কাঁপতে থাকা হাত দিয়ে ফোনের সোশ্যাল মিডিয়া স্ক্রল করছিল। চারদিকের নিয়ন আলো আর হাসপাতালের নিস্তব্ধতার মাঝে হঠাৎই একটা ছবি দেখে ওর আঙুল দুটো স্ক্রিনের ওপর থমকে গেল। ওর বুকের ভেতরটা এক লহমায় ওলটপালট হয়ে গেল।

ছবিটা দীপান্বিতার।

লাল টুকটুকে বেনারসি পরে, কপালে চন্দনের কলকা কেটে বিয়ের মণ্ডপে বসে রয়েছে ও। পাশে বসে ওর নতুন হাজব্যান্ড। গ্লিটারি আর গ্লোয়িং ব্রাইডাল মেকআপে, কনের সাজে দীপান্বিতাকে আজ পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দরী মেয়ে লাগছিল। ওর ওই মায়াবী চোখ দুটো আজ যেন এক নতুন জীবনের আলোয় চকচক করছে।

ছবিটার দিকে তাকিয়ে সাগরের চোখের কোণ বেয়ে দুটো ফোঁটা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল। ওর বুকের ভেতরটা এক তীব্র, অসহ্য কষ্টে মোচড় দিয়ে উঠল। এক বছর আগের ওপিডি করিডোর আর কুঞ্জবনের সেই দিনগুলো ওর চোখের সামনে ভেসে এল। ও যদি আজ সুস্থ হতো, ওর ফুসফুসটা যদি ক্যানসারের নীল বিষে ক্ষয়ে না যেত, তবে হয়তো আজ ওই লাল বেনারসি পরা মেয়েটার পাশে ও নিজে বরের সাজে বসে থাকত। দীপান্বিতা আজ ওর ঘরণী হতো। এই চরম সত্যের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সাগরের মনটা এক গভীর দুঃখে আর হাহাকারে ভেঙে চুরমার হয়ে গেল।

কিন্তু, ঠিক সেই তীব্র কষ্টের মাঝেই, সাগরের মনের একদম গহীন কোণে এক অদ্ভুত, অলিখিত শান্তি আর একচিলতে খুশির হাওয়া বয়ে গেল। ও খুব ভালো করেই জানত, ও নিজে তো একাকী বাজপাখি; ক্যানসারের মরণব্যাধি ওর সেই স্বাধীন ডানা দুটোকে চিরতরে ভেঙে দিয়েছে, ও আর কোনোদিন ডানা মেলে খোলা আকাশে উড়তে পারবে না। কিন্তু দীপান্বিতা তো আজ মুক্ত। সমাজ, পরিবার আর এক জ্যান্ত লাশের কেয়ারগিভিং করার নির্মম খাঁচা থেকে বেরিয়ে ও আজ নিজের ডানাগুলো মেলে ধরেছে খোলা আকাশে ডানা মেলার জন্য। ওর এই উড়ানটাই তো সাগর চেয়েছিল।

সাগর নিজের সমস্ত শক্তি এক জায়গায় জড়ো করল। কাঁপতে কাঁপতে ও নিজের ফেসবুকের দেওয়ালে একটা শেষ পোস্ট লিখতে শুরু করল, তবে লেখার সময় ওর ভেতরের ম্যাচিউরড প্রেমিক সত্তাটা এক মুহূর্তের জন্য সজাগ হয়ে উঠল। ও পোস্টে কোনো 'দীপান্বিতা' বা 'দীপু' নাম মেনশন করল না। কারণ ও খুব ভালো করেই জানত, ও নিজে আজ চলে যাবে, কিন্তু ওর এই পোস্টের কারণে ভবিষ্যতে কোনোদিনও যেন দীপান্বিতার নতুন সাংসারিক জীবনে কোনো কালিমালিপ্ত না হয়, কোনো অশান্তির ঝড় না ওঠে। নিজের শেষ নিঃশ্বাস দিয়েও ও ওর ভালোবাসার মানুষটাকে একদম নিরাপদে, আগলে রেখে যেতে চেয়েছিল। ও স্রেফ নামহীনভাবে লিখল:

“আমি আজ যেখানে দাঁড়িয়ে এই মেসেজটা লিখছি, সেখান থেকে জীবনের সব হিসেব বড্ড পরিষ্কার দেখায়। সেদিন কুঞ্জবনের ফ্ল্যাটে তুমি যে সম্পর্ক থেকে মুক্তি চেয়েছিলে, ওটা তোমার স্বার্থপরতা ছিল না, ওটা ছিল একটা মেয়ের বাঁচার আকুতি। তুমি আমার শেষ দিনগুলোর কষ্ট সামলেছো, নিজের সবটুকু দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছো। সমাজ তোমাকে যত ইগো আর সামাজিক দেয়ালের খোটা দিক না কেন, তুমি মনে রেখো—তুমি তোমার জীবনের সবচেয়ে খাঁটি ইমোশনটা আমাকে দিয়েছো। আমার এই বাজপাখির ডানা ভাঙা শরীরটা হয়তো আর থাকবে না, কিন্তু মৃত্যুর ওপারে গিয়েও আমি চাইব—তুমি যেন কোনোদিন কোনো সামাজিক খাঁচায় বন্দি না হও। তুমি মুক্ত আকাশ চিনে নাও। তুমি ডানা মেলো।"

পোস্টটা লেখা শেষ করে সাগর একটা গভীর শ্বাস নিল। ওর মুখে তখন সেই প্রথম দিনের মতো চেনা, নিষ্পাপ আর শান্ত একচিলতে হাসি। ও নিজের কাঁপতে থাকা আঙুলটা দিয়ে স্ক্রিনের 'Publish' বাটনে প্রেস করল।

আর ঠিক সেই মুহূর্তেই, সাগরের হাত থেকে ফোনটা আলগা হয়ে খসে হাসপাতালের সাদা বেডের ওপর পড়ে গেল। ও নিজের চোখ দুটো চিরকালের মতো বুজে নিল।

ঠিক তখনই কেবিনের নীরবতা ফালাফালা করে দিয়ে পাশের হার্ট মনিটরে একটা একটানা, তীক্ষ্ণ শব্দ বেজে উঠল—

"বিইইইইইইইইইইইইইইপ..."

মনিটরের সেই সোজা হয়ে যাওয়া সবুজ লাইনটা জানিয়ে দিল, আগরতলার ব্যস্ত ভিড়ে, একটা সাধারণ এমআর-এর শান্ত চোখের সরলতা আর এক ডাক্তার মেয়ের মায়াবী চোখের নীরব টান—সমস্ত সামাজিক হীনমন্যতা আর পার্থিব নিয়মের ওপারে গিয়ে এক নিটোল, পবিত্র আর ম্যাচিউরড অমর প্রেমের মহাকাব্য তৈরি করে দিয়ে চিরতরে শেষ হয়ে গেছে। সাগরের বাজপাখিটা আজ সত্যিই সব খাঁচা ভেঙে মুক্ত আকাশে উড়ে গেছে।


 ********************


দেখতে দেখতে একটা পুরো বছর কেটে গেছে।

আজ দীপান্বিতার প্রথম ম্যারেজ অ্যানিভার্সারি। ঘড়িতে যখন ঠিক রাত বারোটা বাজল, ওর হাজব্যান্ড ওকে একটা দারুণ সারপ্রাইজ দিল। কেক কাটা, হাসিখুশি ছবি তোলা আর নিজেদের মতো করে সুন্দর কিছু সময় কাটানো—সব মিলিয়ে প্রথম অ্যানিভার্সারির সেলিব্রেশনটা দারুণ কাটল। গত একটা বছর ধরে দীপান্বিতা ওর এই নতুন সংসার আর হাসপাতালের মেডিকেল প্র্যাকটিসের চেনা ব্যস্ততায় নিজেকে এতটাই ডুবিয়ে রেখেছিল যে, ওর জীবন থেকে সাগরের স্মৃতিটা প্রায় পুরোটাই হারিয়ে গিয়েছিল। ও যেন এক চেনা রুটিনে সাগরকে অনেকটা ভুলেই গিয়েছিল।

সব গুছিয়ে, সেলিব্রেশন শেষ করে ওদের ঘুমাতে ঘুমাতে তখন রাত প্রায় আড়াইটে (2:30 AM)।

হাজব্যান্ড ততক্ষণে গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। দীপান্বিতাও বিছানায় শুয়ে ঘুমানোর আগে অভ্যাসবশত ফোনটা হাতে নিল। ঠিক তখনই স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল আর ফেসবুক থেকে একটা অদ্ভুত নোটিফিকেশন ভেসে এল—"You have a memory from 1 year ago..." সাগরের সেই নামহীন শেষ পোস্টের মেমোরি নোটিফিকেশন।

নোটিফিকেশনটা দেখামাত্রই দীপান্বিতার বুকটা যেন এক লহমায় ছ্যাঁত করে উঠল। ওর গায়ের পশম খাড়া হয়ে গেল। এক ঝটকায় ওর মনে পড়ে গেল—আজ থেকে ঠিক এক বছর আগে, আজকের এই দিনটাতেই ক্যানসার হাসপাতালের বেডে শুয়ে সাগর মারা গিয়েছিল। আজ ও নিজের অ্যানিভার্সারি সেলিব্রেট করছে, অথচ আজই সাগরের প্রথম মৃত্যুবার্ষিকী! এক তীব্র অপরাধবোধ আর চাপা কষ্ট ওর দম আটকে ধরল। ও আলতো করে বিছানা থেকে উঠে নিঃশব্দে এসে বারান্দার রেলিং ধরে দাঁড়াল।

বাইরে তখন ঝিরঝিরে হাওয়া বইছে। দীপান্বিতার হাত দুটো কাঁপছিল। গত এক বছর ধরে ও যে সত্যিটাকে এড়িয়ে চলেছিল, আজ তা ওর সামনে এসে দাঁড়িয়েছে। ও তখনও মনের গভীরে এক তীব্র 'গিল্ট ফিল' করত যে ও সাগরকে ওই কঠিন সময়ে ওভাবে ছেড়ে চলে এসেছিল। ও ভাবছিল, মরার আগে ওই পোস্টে সাগর নিশ্চয়ই ওকে ভালোমন্দ কিছু একটা বলেছে, হয়তো ওকে গালাগাল দিয়েছে বা ওর স্বার্থপরতা নিয়ে কোনো কটু কথা লিখে গেছে।

তীব্র ভয় আর বুক কাঁপানো সংশয় নিয়ে ও অবশেষে সাহস করে মেমোরি পোস্টটা খুলল। স্ক্রিনের আলোয় ওর চোখ দুটো আটকে গেল। ও পড়তে লাগল সাগরের সেই শেষ কথাগুলো:

“আমি আজ যেখানে দাঁড়িয়ে এই মেসেজটা লিখছি, সেখান থেকে জীবনের সব হিসেব বড্ড পরিষ্কার দেখায়। সেদিন কুঞ্জবনের ফ্ল্যাটে তুমি যে সম্পর্ক থেকে মুক্তি চেয়েছিলে, ওটা তোমার স্বার্থপরতা ছিল না, ওটা ছিল একটা মেয়ের বাঁচার আকুতি। তুমি আমার শেষ দিনগুলোর কষ্ট সামলেছো, নিজের সবটুকু দিয়ে দায়িত্ব পালন করেছো। সমাজ তোমাকে যত ইগো আর সামাজিক দেয়ালের খোটা দিক না কেন, তুমি মনে রেখো—তুমি তোমার জীবনের সবচেয়ে খাঁটি ইমোশনটা আমাকে দিয়েছো। আমার এই বাজপাখির ডানা ভাঙা শরীরটা হয়তো আর থাকবে না, কিন্তু মৃত্যুর ওপারে গিয়েও আমি চাইব—তুমি যেন কোনোদিন কোনো সামাজিক খাঁচায় বন্দি না হও। তুমি মুক্ত আকাশ চিনে নাও। তুমি ডানা মেলো।"

পোস্টটা পড়া শেষ হতেই দীপান্বিতার মায়াবী চোখ দুটো জলে ভেসে গেল। ওর চোখ দিয়ে টপটপ করে জল গড়িয়ে পড়তে লাগল ওর ফোনের স্ক্রিনের ওপর।

ও ভাবছিল কটু কথা, অথচ ওর ভালোবাসার মানুষটা নিজের শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগের মুহূর্তেও ওর নামটুকু পর্যন্ত লুকিয়ে ওকে আগলে রেখে গেছে। ওর নতুন সংসারে যাতে কোনোদিন কোনো ঝামেলা না হয়, সেই জন্য নিজের সবটুকু কষ্ট আড়াল করে ও স্রেফ দীপান্বিতার ভালোটাই চেয়ে গেছে।

দীপান্বিতা চোখের জল মুছে বারান্দা থেকে রাতের বিশাল আকাশটার দিকে তাকাল। ওর বুকের ভেতরের সেই এক বছরের জমে থাকা অপরাধবোধের ভারী পাথরটা এক মুহূর্তে গলে জল হয়ে গেল। ওর মনটা এক তীব্র শান্তিতে ভরে উঠল। ও বুঝতে পারল, ও একা নয়, ও যেখানেই থাকুক, আকাশের ওই ওপার থেকে সাগরের সেই ডানা ভাঙা বাজপাখিটা আজও ওকে আগলে রাখছে। একটা গভীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে ও মনে মনে হাসল—এক অদ্ভুত বিষাদ আর এক চিলতে সুখের মেলবন্ধনে ও খুঁজে পেল ওর জীবনের আসল মুক্তি। সাগরের বাজপাখিটা আজ সত্যি সব খাঁচা ভেঙে মুক্ত আকাশে উড়ে গেছে, আর দীপান্বিতাকেও দিয়ে গেছে চিরকালের মতো ডানা মেলার অমোঘ সাহস।



THE END


Comments