তুমি ডানা মেলো | Tumi Dana Melo | Chapter 04 | A tragic love story of a medical representative and a doctor by Tanmoy Roy | Cholo Golpo Suni
********************
PLEASE READ CHAPTER 01, CHAPTER 02, CHAPTER 03 FIRST
********************
Chapter 4 starts ...
কুঞ্জবনের সেই ছোট্ট ভাড়াবাড়ির চার দেওয়ালে ওদের ভালোবাসার বসন্তটা বেশিদিন নির্বিঘ্নে কাটতে পারল না। আগরতলার বাতাস বড্ড ছোট, আর সেখানে একটা যুবতী সরকারি ডাক্তার ও একজন চাকরিহীন ক্যানসার পেশেন্ট যুবকের লিভ-ইন করার খবর ছড়াতে সময় লাগল না। খুব দ্রুত এই খবর পৌঁছে গেল দুই পরিবারে।
একদিন সকালে সাগরের বৃদ্ধ মা-বাবা গ্রাম থেকে হন্তদন্ত হয়ে কুঞ্জবনের ফ্ল্যাটে এসে হাজির হলেন। ছেলের এই মরণব্যাধির খবর আর কঙ্কালসার চেহারা দেখে মা কান্নায় ভেঙে পড়লেন। সাগরের বাবা দীপান্বিতার হাত জোড় করে বললেন, "মা, তুমি ডাক্তার মানুষ, আমাদের ছেলের জন্য যা করেছ তা ভগবানের চেয়েও বড়। কিন্তু তোমরা এভাবে অবিবাহিত হয়ে এক ছাদের নিচে থাকলে সমাজে আমাদের মাথা কাটা যাবে। কলঙ্ক রটবে। তার চেয়ে আমরা ছেলেকে গ্রামে আমাদের কুঁড়েঘরে নিয়ে যাই, সেখানেই ও শেষ কটা দিন শান্তিতে থাক।"
দীপান্বিতা সাগরের মা-বাবার হাত ধরে ওনাদের আশ্বস্ত করল। ও খুব পরিষ্কার ভাষায় বুঝিয়ে দিল, ক্যানসারের প্রোপার ট্রিটমেন্ট, কেমোর প্রোটোকল আর ইমার্জেন্সি সাপোর্ট গ্রামের বাড়িতে সম্ভব নয়, সাগরের জীবন বাঁচাতে ওকে আগরতলাতেই আটকে রাখতে হবে। সাগরের মা-বাবা মেয়ের এই জেদ আর ভালোবাসা দেখে শেষ পর্যন্ত বুঝলেন এবং চোখের জল মুছতে মুছতে গ্রামে ফিরে গেলেন।
কিন্তু সাগরের মা-বাবা বুঝলেও, এই অবিবাহিতভাবে এক ছাদের নিচে থাকা নিয়ে ওনাদের মনের ভেতরের দ্বিধা আর সমাজের ভয়টা দীপান্বিতা টের পেয়েছিল। ও সিদ্ধান্ত নিল, সমস্ত সামাজিক মুখরোচক গল্পের মুখে ছাই দিয়ে ও সাগরকে আইনি স্বীকৃতি দেবে। ও সাগরকে বলল, "সাগর, আমরা কোনো ধুমধাম করব না। আগামী সপ্তাহেই আমরা Court Marriage করব।"
কিন্তু আসল ঝড়টা ধেয়ে এল ওদিক থেকে। দীপান্বিতার সচ্ছল, উচ্চশিক্ষিত পরিবারের কাছে এই খবর যাওয়া মাত্রই ওনার মা-বাবা চরম ক্ষোভে ফেটে পড়লেন। ওনারা সোজা আগরতলায় এসে দীপান্বিতার ফ্ল্যাটে চড়াও হলেন।
দীপান্বিতার বাবা সরকারি বড় অফিসার, ওনার ইগো আর সামাজিক স্ট্যাটাসে মারাত্মক আঘাত লেগেছিল। ওনারা দীপান্বিতাকে স্পষ্ট জানিয়ে দিলেন, একজন মরোমরো ক্যানসার পেশেন্ট, যার কোনো চাকরি নেই, তার সাথে ওনারা ওনাদের একমাত্র মেয়ের জীবন নষ্ট হতে দেবেন না। দীপান্বিতার মা কেঁদে কেঁদে বললেন, "তোর কি মাথা খারাপ হয়েছে দীপু? একটা জ্যান্ত লাশের গলায় তুই মালা দিবি? ও কদিন বাঁচবে তুই জানিস?"
দীপান্বিতা নিজের সিদ্ধান্তে অনড় ছিল, কিন্তু ওনার মা-বাবা আইনি জটিলতা তৈরি করতে ছাড়লেন না। ওনারা কোর্টের এক চেনা আইনজীবীকে দিয়ে সাগরের অসুস্থতা আর মানসিক অবস্থার দোহাই পেড়ে আইনি নোটিশের ভয় দেখালেন এবং দীপান্বিতার ওপর মারাত্মক ফ্যামিলি প্রেসার সৃষ্টি করে সেই কোর্ট ম্যারেজটা সাময়িকভাবে স্থগিত (Postpone) করিয়ে দিলেন। ওনারা দীপান্বিতার সাথে সমস্ত সম্পর্ক ছিন্ন করার হুমকি দিয়ে চলে গেলেন।
ফ্যামিলির এই চরম বাধার পাশাপাশি হাসপাতালের পরিবেশটাও দিন দিন বিষাক্ত হয়ে উঠছিল। AGMC আর জিবিপির করিডোরে, ওপিডির আড়ালে, কিংবা ডক্টরস ক্যান্টিনের কফির টেবিলে দীপান্বিতাকে নিয়ে নির্মম ট্রোলিং শুরু হলো। ওনার জুনিয়র-সিনিয়র কলিগরা আড়ালে হাসাহাসি করতে লাগল। কেউ আড়ালে বলত, "এত ভাল ডাক্তার হয়ে একটা এমআর-এর চক্করে নিজের লাইফটা স্পয়েল করল!" কেউ আবার ওপিডি ফাইলের আড়ালে মুখ টিপে হাসত।
দীপান্বিতা যখন করিডোর দিয়ে হেঁটে যেতেন, ওনার কানের পাশ দিয়ে সেই ফিসফিসানি আর বাঁকা চাহনিগুলো পার হয়ে যেত। ওনার মায়াবী চোখ দুটো এই সামাজিক অপমান আর আইনি টানাপোড়েনে ক্লান্ত হয়ে উঠছিল, কিন্তু ও নিজের ভেতরের এই লড়াইটা সাগরের সামনে বুঝতে দিত না। ও রোজ রাতে ঘরে ফিরে সাগরের কপালে হাত বুলিয়ে হাসার চেষ্টা করত, কিন্তু ওনার সেই হাসির আড়ালে জমে উঠছিল এক আকাশ মানসিক একাকীত্ব আর ক্লান্তি।
********************
আইনি জটিলতা আর সামাজিক অপমানের সেই কালো মেঘ কুঞ্জবনের ভাড়াবাড়িটার ওপর যেন স্থায়ীভাবে থিতু হয়ে বসল। ক্যালেন্ডারের পাতা ওল্টানোর সাথে সাথে সাগরের ক্যানসার আক্রান্ত শরীরটা আরও বেশি করে ভাঙতে শুরু করল। কেমোর একেকটা সাইকেল শেষ হওয়ার পর ও বিছানা থেকে ওঠার শক্তিটুকুও হারিয়ে ফেলত। রাতে ওর তীব্র হাড় কাঁপানো যন্ত্রণার গোঙানি আর ফুসফুস ছিঁড়ে আসা কাশির শব্দে ফ্ল্যাটের বাতাস ভারী হয়ে থাকত।
ওদিকে দীপান্বিতার ওপর দিয়ে তখন এক অলিখিত মানসিক ও শারীরিক সুনামি বয়ে যাচ্ছে। একদিকে হাসপাতালের অনবরত নাইট ডিউটি ও ওপিডি-র উপচে পড়া পেশেন্টের চাপ, অন্যদিকে বাড়ি ফিরেই একজন ক্যানসার পেশেন্টের নার্সিং করা—সব মিলিয়ে ওনার নিজের ২৪ ঘণ্টার রুটিনটা নরক হয়ে উঠেছিল। তার ওপর যোগ হয়েছিল ওনার নিজের ফ্যামিলির অনবরত মেন্টাল প্রেসার আর হাসপাতালের কলিগদের সেই বিষাক্ত ট্রোলিং ও আড়ালে হাসাহাসি। প্রতিদিন একটা জ্যান্ত, হাসিখুশি মানুষকে চোখের সামনে তিলে তিলে গলে শেষ হয়ে যেতে দেখে দীপান্বিতার ভেতরের শক্ত ডাক্তারী সত্তাটাও আস্তে আস্তে ভেঙে পড়তে লাগল। এই চেনা একঘেয়েমি আর চরম অসহায়তা ওনার ভেতরে এক তীব্র মানসিক ক্লান্তি আর ফ্রাস্ট্রেশন (Frustration) জন্ম দিল।
ধীরে ধীরে এই ক্লান্তির প্রভাব এসে পড়ল ওদের দৈনন্দিন সম্পর্কে।
একটা সময় যে ভাড়াবাড়ির ঘরে রাত জেগে কত গল্প হতো, সাগরের মাথায় হাত বুলিয়ে দীপান্বিতা সান্ত্বনা দিত—আজ সেই ঘরে এক অদ্ভুত, থমথমে নীরবতা নেমে এসেছে। আস্তে আস্তে সাগরের সাথে দীপান্বিতার আগের মতো মন খুলে কথা বলা এক্কেবারে বন্ধ হয়ে গেল। দুজনের মাঝখানের সেই চেনা ভালোবাসার উষ্ণতাটা কোথায় যেন হারিয়ে গেল। এখন কুঞ্জবনের সেই ফ্ল্যাটে সম্পর্কটা শুধু ঔষধের টাইমিং-এ এসে ঠেকেছে।
দীপান্বিতা ডিউটি থেকে ফিরে যান্ত্রিকভাবে ওনার ব্যাগটা টেবিল রাখতেন। ঘড়ির দিকে তাকিয়ে অত্যন্ত শুকনো মুখে সাগরের বিছানার পাশে গিয়ে দাঁড়াতেন।
"সাগর, এই দুটো ক্যাপসুল আর সিরাপটা খেয়ে নাও।" ব্যস, ওনার গলাটা ছিল ভীষণ শীতল ও অভিব্যক্তিহীন।
সাগরও ওনার চোখের ভেতরের সেই চরম ক্লান্তি আর ফ্রাস্ট্রেশনটা খুব স্পষ্ট বুঝতে পারত। ও কোনো প্রশ্ন না করে ঔষধটা মুখে দিয়ে দিত।
সময়মতো ঔষধ দেওয়া হতো ঠিকই, সাগরের ট্রিটমেন্টের কোনো খামতি দীপান্বিতা রাখেনি, কিন্তু এক্সট্রা আর কোনো কথা ওদের মধ্যে হতো না। ঔষধ খাওয়ার পর দীপান্বিতা পাশের ঘরে গিয়ে ল্যাপটপ খুলে বসতেন কিংবা চুপচাপ দেওয়ালের দিকে তাকিয়ে নিজের অবসাদ ঢাকবার চেষ্টা করতেন। আর সাগর একা বিছানায় শুয়ে জানলার বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে নিজের নিয়তিকে কোসত। ও বুঝতে পারছিল, ওর এই মরণব্যাধি শুধু ওর শরীরটাকে নয়, দীপান্বিতার মতো একটা প্রাণোচ্ছল মেয়ের জীবনটাকেও ভেতরে ভেতরে পুরো চুরমার করে দিচ্ছে।
********************
কুঞ্জবনের সেই ভাড়াবাড়ির থমথমে নীরবতা যখন দীপান্বিতার দম আটকে ধরছিল, ঠিক তখনই হাসপাতালের চার দেওয়ালে ওনার ভাঙা মনটা এক অদ্ভুত সমান্তরাল আশ্রয়ের খোঁজ পেতে শুরু করল। মানুষের মন বড্ড বিচিত্র; যখন চারদিকের সমস্ত চেনা দরজা বন্ধ হয়ে যায়, তখন অবচেতন মন নিজের অজান্তেই একটুখানি বাঁচার জন্য, একটুখানি মানসিক স্বস্তির জন্য কোনো একটা খড়কুটো আঁকড়ে ধরতে চায়।
এই চরম মানসিক অবসাদ আর একাকীত্বের দিনগুলোতে দীপান্বিতার পাশে এসে দাঁড়িয়েছিলেন ওনারই ডিপার্টমেন্টের একজন সিনিয়র রেসিডেন্ট ডক্টর।
মেডিক্যাল কলেজের চেনা ডাক্তারী মহলে যখন সবাই দীপান্বিতাকে নিয়ে আড়ালে নোংরা ট্রোলিং করছিল, ওনার মা-বাবার অনবরত ফোনে মানসিক নির্যাতন চলছিল—তখন এই সিনিয়র ডাক্তারটি কিন্তু এক ফোঁটাও ওনাকে জাজ করেননি। ওপিডি-র উপচে পড়া ভিড়ের মাঝে যখন দীপান্বিতা ক্লান্তিতে চেয়ারে মাথা নিচু করে বসে থাকতেন, তখন ওনার টেবিলে এক কাপ গরম কফি আর এক চিলতে সান্ত্বনা এসে পৌঁছাত এই মানুষটার হাত ধরেই।
"দীপু, গত রাতের নাইট ডিউটিটার পর আজ সকালে তোমার ওপিডি-টা আমি টেক ওভার করে নিচ্ছি। তুমি একটু রেস্ট হাউজে গিয়ে এক ঘণ্টা ঘুমিয়ে নাও।" ওনার এই শান্ত, ভরসা জাগানো কন্ঠস্বরটা দীপান্বিতার ওই বিধ্বস্ত মনে মরুভূমির বুকে এক পশলা বৃষ্টির মতো শোনাত।
ধীরে ধীরে হাসপাতালের সেই চেনা করিডোর, রাউন্ড টেবিল ডিসকাশন আর ইমার্জেন্সি ওয়ার্ডের ব্যস্ততার মাঝে এই সিনিয়র ডাক্তারটির প্রতি দীপান্বিতার একটা সফট কর্নার বা মানসিক নির্ভরতা তৈরি হতে থাকল। এই মানুষটি দীপান্বিতার এই কঠিন সময়ে ওনাকে স্রেফ কাজের দিক থেকেই আগলে রাখেনি, ওনার ভেতরের সেই গুমরে মরা ফ্রাস্ট্রেশনের কথাগুলো খুব মন দিয়ে শুনত। ওনার সামনে বসলে দীপান্বিতাকে কোনো মুখোশ পরতে হতো না, কোনো অপরাধবোধে ভুগতে হতো না। ওনার কাছে দীপান্বিতা স্রেফ এক ক্লান্ত, অসহায় মেয়ে যে একটুখানি মানসিক শান্তি খুঁজছে।
দীপান্বিতা নিজেও বুঝতে পারছিলেন যে ওনার অবচেতন মন একটু একটু করে সাগরের সেই অন্ধকার ঘরটা থেকে বেরিয়ে এই নতুন আলোর দিকে ঝুঁকছে। রাতে যখন ও কুঞ্জবনের ফ্ল্যাটে ফিরত, আর বিছানায় সাগরের সেই কঙ্কালসার ফ্যাকাশে শরীরটার দিকে তাকাত, ওনার নিজের ভেতরে এক তীব্র অপরাধবোধ জন্ম নিত। ও নিজেকেই নিজে প্রশ্ন করত—ও কি তবে স্বার্থপর হয়ে যাচ্ছে? ও কি সাগরের সাথে অন্যায় করছে?
কিন্তু পরদিনই যখন আবার হাসপাতালের সেই বিষাক্ত প্রেসার আর একাকীত্ব ওনাকে গ্রাস করত, ওর মন আবার সেই সিনিয়র ডাক্তারের ওই চেনা ভরসার হাতটার দিকেই ছুটে যেত। দীপান্বিতা বুঝতে পারছিলো, সাগরের প্রতি ওনার ট্রিটমেন্ট বা কর্তব্যের কোনো খামতি না থাকলেও, ওর মনের আসল আশ্রয়টা অলরেডি বদলে গেছে। এক নির্মম বাস্তব আর অবচেতন মনের এই দ্বন্দ্বে দীপান্বিতা প্রতিদিন ভেতরে ভেতরে একটু একটু করে ক্ষয় হয়ে যাচ্ছিলো।
Chapter 04 ends ...
********************
PLEASE CONTINUE READING CHAPTER 05
********************
📢 পাঠকদের উদ্দেশ্যে
গল্পটি পড়ে আপনার কেমন লাগল, তা অবশ্যই নিচের কমেন্ট বক্সে জানাবেন। আপনার মতামত, পরামর্শ এবং সমালোচনা আমাদের আরও ভালো গল্প উপহার দিতে অনুপ্রাণিত করে। গল্পটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন, যাতে আরও বাংলা গল্পপ্রেমীরা এটি পড়ার সুযোগ পান। আপনার একটি শেয়ার এবং একটি মন্তব্য আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। ❤️
Tanmoy Roy
Bengali Author • Storyteller • Founder & Lead Author of CHOLO GOLPO SUNI
Tanmoy Roy is a Bengali author, storyteller, and founder of CHOLO GOLPO SUNI. He writes original Bengali fiction across mystery, thriller, horror, adventure and emotional drama. His stories focus on suspense, realism, emotion and memorable characters, creating immersive reading experiences for Bengali readers worldwide.
Mystery • Thriller • Horror • Adventure • Emotional Drama • Bengali Fiction
© Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI | Bengali Mystery, Thriller, Horror & Original Fiction

Comments
Post a Comment