তুমি ডানা মেলো | Tumi Dana Melo | Chapter 01 | A tragic love story of a medical representative and a doctor by Tanmoy Roy | Cholo Golpo Suni


কিছু গল্পে কোনো ভিলেন থাকে না। কোনো পরকীয়া থাকে না, কোনো ধোঁকা বা প্রতারণাও থাকে না। সেখানে শুধু থাকে এক নির্মম বাস্তব, চারপাশের এক বিষাক্ত সমাজ আর দুটো মানুষের বুকফাটা নীরবতা।

আগরতলার এজিএমসি হাসপাতালের ওপিডি করিডোরের ১ নম্বর চেম্বারের ভারী কাঠের দরজার বাইরে প্রতিদিন শয়ে শয়ে মানুষ ভিড় করে। কেউ আসে রোগ সারানোর আশায়, কেউ আসে একটুখানি বেঁচে থাকার তাগিদে। কিন্তু এক বছর আগে, ওই করিডোরের ঠিক কোণের দেয়ালটায় একটা নীল শার্ট পরা ছেলে কাঁধে লেদারের ব্যাগ ঝুলিয়ে শান্ত চোখে দাঁড়িয়ে থাকত। ওর চোখের সরলতা আর হাসির ভেতরের আত্মসম্মানবোধ এক লহমায় চেনা যেত। ও ছিল সাগর—এক স্বাধীন, উড়ন্ত বাজপাখি।

আর ওপিডি চেম্বারের ভেতরে বসতেন ডক্টর দীপান্বিতা। মায়াবী চোখের এক জেদি, প্রাণোচ্ছল ডাক্তার মেয়ে।

আজ সেই ওপিডি করিডোরে সাগর আর দাঁড়িয়ে নেই। কুঞ্জবনের সেই ছোট্ট ভাড়াবাড়িটার বারান্দায় এখন আর দুটো মানুষের ছায়া একসঙ্গে পড়ে না। কিন্তু হাসপাতালের করিডোর থেকে শুরু করে এক ছাদের নিচে কাটানো সেই রাতগুলোর নীরব সাক্ষী হয়ে আজও এই আগরতলার বাতাস একটা অদ্ভুত অসম প্রেমের গল্প ফিসফিস করে বলে যায়।

যে গল্পে ভালোবাসা ছিল নিটোল, কিন্তু পরিস্থিতি ছিল নরক। যেখানে একটা মেয়ে নিজের কেরিয়ার, সমাজ, পরিবার সব বাজি রেখে একটা মরণাপন্ন মানুষকে আগলে ধরেছিল, আর শেষে এক চরম মানসিক ক্লান্তি আর অবচেতন মনের দ্বন্দ্বে নিজেই সেই সম্পর্কের অবসান চেয়েছিল। আর এক চরম ম্যাচিউরড প্রেমিক নিজের শেষ নিঃশ্বাস দিয়ে, নিজের নামটুকু পর্যন্ত আড়াল করে, তার ভালোবাসার মানুষকে এক মুক্ত আকাশ উপহার দিয়ে চিরতরে ডানা মেলে দিয়েছিল ওপারে।

এটা কেবল একটা প্রেমের গল্প নয়; এটা ক্যানসারের নীল বিষে ক্ষয়ে যাওয়া একটা শরীর, পরিস্থিতির চাপে পিষে যাওয়া একটা মেয়ের অসহায়তা এবং ভালোবাসার খাতিরে হাসিমুখে একে অপরকে চিরতরে 'মুক্তি' দেওয়ার এক পরম ট্র্যাজেডির মহাকাব্য।

********************

আগরতলার চৈত্র মাসের দুপুরগুলো বড্ড বেশি প্যাচপ্যাচে আর অবাধ্য হয়। রোদের তেজ এতটাই চড়া যে, হাসপাতালের ছাদ ফুঁড়ে যেন একটা গরম ভাপ নেমে আসছিল করিডোরে। Agartala Government Medical College (AGMC)-এর ওপিডি বিল্ডিংয়ের তিন তলার করিডোরটা এই দুপুর দুটোতেও থিকথিক করছে লোকজনে। চারদিকের মানুষের চ্যাঁচামেচি, বাচ্চাদের কান্না, আর ফ্যানের একটানা ঘড়ঘড় শব্দের মাঝেও একটা তীব্র ডেটল আর ফিনাইলের গন্ধ বাতাসটাকে ভারী করে রেখেছে।

সাগর ওর ফর্মাল হালকা নীল শার্টের হাতাটা কনুই পর্যন্ত গুটিয়ে, একহাতে তার ভারী ব্ল্যাক লেদারের মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভ ব্যাগটা সামলে দেয়ালের একপাশে দাঁড়িয়ে ছিল। কপালের ঘামটা রুমাল দিয়ে মুছে ও একবার ঘড়ির দিকে তাকাল। সকাল ১০টা থেকে ও এই ওপিডি-র করিডোরে ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। দুটো কোম্পানির নতুন ড্রাগ লঞ্চের লিটারেচার ডাক্তারদের দেখাতে হবে, কিন্তু চৈত্র মাসের এই গরমে ওপিডি শেষ হওয়ার নাম নেই। সাগরের পায়ের জুতো জোড়া ধুলোয় ধূসর হয়ে গেছে, কিন্তু ওর প্রফেশনাল হাসি আর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে থাকার জেদটা তখনও ম্লান হয়নি। ও জানে, জীবনযুদ্ধের এই পিচটা বড্ড কঠিন, এখানে এক ফোঁটা ঢিলেমি মানেই পরের মাসের ইনসেনটিভটা হাতছাড়া।

ঠিক তখনই ১ নম্বর চেম্বারের ভারী কাঠের দরজাটা ঠেলে করিডোরে বেরিয়ে এলেন ডঃ দীপান্বিতা।

চোখে একটা ক্লান্তি, মুখের চেনা মাস্কটা থুতনির নিচে নামানো। পরনে একটা হালকা সুতির শাড়ি, তার ওপর জড়ানো সাদা অ্যাপ্রন। স্টেথোস্কোপটা চেনা ছন্দে ওনার কাঁধ থেকে ঝুলছে। দীপান্বিতার ডানহাতে চার-পাঁচটা মোটা ওপিডি ফাইল আর বাঁহাতে একটা জলের বোতল। ওনার চোখ দুটো লালচে হয়ে আছে, দেখলেই বোঝা যায় গত রাতের ইমার্জেন্সি নাইট ডিউটির পর আজ একটানা চার ঘণ্টা ওপিডি সামলেছেন। আগরতলার এই প্রচণ্ড গরমে ওনার কপালের ছোট ছোট চুলগুলো ঘামে কপালে লেপ্টে আছে।

সাগর একটু সোজা হয়ে দাঁড়াল। ও জানে, এটাই ওর সুযোগ। কিন্তু ও এটাও বোঝে যে, এই ক্লান্ত ডাক্তারকে এখন কোম্পানির ওষুধের জ্ঞান দিতে গেলে হিতে বিপরীত হবে। ও নিজের ব্যাগটা ঠিক করে জাস্ট একটা প্রফেশনাল ভদ্রতার হাসি মুখে ফুটিয়ে দীপান্বিতাকে একটু পাশ দেওয়ার জন্য দেয়ালের সাথে চেপে দাঁড়াল।

দীপান্বিতা ক্লান্ত পায়ে করিডোর দিয়ে এগিয়ে যাচ্ছিলেন। ওনার মাথায় তখন হয়তো কোনো আশঙ্কাজনক পেশেন্টের ইনভেস্টিগেশন রিপোর্ট ঘুরছিল। হঠাৎ করিডোরের এক কোণে দাঁড়িয়ে থাকা একটা পেশেন্টের অ্যাটেনডেন্ট ওনার পাশ দিয়ে তাড়াহুড়ো করে যেতে গিয়ে দীপান্বিতার কনুইতে আলতো ধাক্কা মেরে বসল।

ব্যস! আচমকা ধাক্কায় দীপান্বিতার হাত থেকে একটা মোটা ফাইল ছিটকে গিয়ে পড়ল হাসপাতালের নোংরা, স্যাঁতসেঁতে মেঝেতে। ফাইলের ভেতর থেকে কয়েকটা প্রেসক্রিপশন আর এক্স-রে রিপোর্টের খাম চারদিকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে গেল।

দীপান্বিতা একটা বিরক্ত আর ক্লান্ত নিঃশ্বাস ফেলে নিচু হতে গেলেন। কিন্তু ওনার আগেই সাগরের এমআর-এর চটপটে শরীরটা ঝুকে পড়েছে মেঝেতে।

সাগর অত্যন্ত ভদ্রতার সাথে, কোনো তাড়াহুড়ো না করে মেঝে থেকে ছিটকে যাওয়া প্রতিটা প্রেসক্রিপশনের কাগজ আর এক্স-রে রিপোর্ট কুড়িয়ে নিল। সবকটা কাগজকে সুন্দর করে এক জায়গায় গুছিয়ে ফাইলের ভেতর ঢুকিয়ে ও দীপান্বিতার দিকে ফাইলটা বাড়িয়ে দিল।

"নিন ম্যাম।" সাগরের গলার স্বরটা ছিল ভীষণ শান্ত এবং প্রফেশনাল। কোনো বাড়তি চাটুকারিতা নেই, স্রেফ একজন দায়িত্ববান মানুষের ভদ্রতা।

দীপান্বিতা ফাইলটা হাত বাড়িয়ে নিলেন। ওনার হাতটা তখন হালকা কাঁপছিল। ফাইলটা নেওয়ার সময় ওনার চোখ দুটো সরাসরি সাগরের চোখের ওপর গিয়ে পড়ল।

দীপান্বিতা দেখলেন, ওনার সামনে দাঁড়িয়ে থাকা ছেলেটার চোখে কোনো তাড়া নেই, বিরক্তি নেই। সাগরের চোখে এক অদ্ভুত শান্ত সরলতা আর মায়া লুকিয়ে আছে। চৈত্র মাসের এই মরুভূমির মতো ওপিডি করিডোরে সাগরের ওই একজোড়া শান্ত চোখের দিকে তাকিয়ে দীপান্বিতার ভেতরের সমস্ত ক্লান্তি যেন এক সেকেন্ডের জন্য থমকে গেল। ওনার মায়াবী চোখ দুটো সাগরের দিকে তাকিয়ে রইল, মুখে কোনো কথা সরল না। স্রেফ একটা নিঃশব্দ কৃতজ্ঞতা যেন ওনার চোখ দিয়ে ঠিকরে বেরোলো।

সাগর কিন্তু নিজের সীমানা জানত। ও নিজের চোখ দুটো আলতো করে নামিয়ে নিল। ও খুব ভালো করেই বোঝে—কোথায় এমআর আর কোথায় সরকারি হাসপাতালের ডাক্তার! ও অত্যন্ত প্রফেশনাল দূরত্ব বজায় রেখে জাস্ট একটা মাথা ঝুঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে বলল, "থ্যাঙ্ক ইউ ম্যাম, ভালো থাকবেন।"

কথাটা বলেই সাগর আর এক মুহূর্তও সেখানে দাঁড়াল না। নিজের ব্ল্যাক লেদারের ব্যাগটা কাঁধে অ্যাডজাস্ট করে ও ভিড়ের মাঝে নিজের কাজে ফিরে গেল। ও একবারের জন্যও পিছন ফিরে তাকাল না।

করিডোরের মাঝখানে দাঁড়িয়ে ডঃ দীপান্বিতা ফাইলটা বুকের কাছে চেপে ধরে কয়েক সেকেন্ড ওভাবেই দাঁড়িয়ে রইলেন। ওনার ক্লান্ত চোখের মণি দুটো তখন করিডোরের ভিড়ে হারিয়ে যাওয়া সাগরের সেই নীল শার্টটার দিকে তাকিয়ে ছিল। হাসপাতালে রোজ কত মানুষ আসে, কত ফাইল পড়ে, কিন্তু এই ছেলেটার ওই অদ্ভুত শান্ত চোখের চেনা ভদ্রতাটা কেন যেন দীপান্বিতার বুকের ভেতর একটা হালকা, অচেনা মুগ্ধতার রেশ রেখে গেল।

********************

চৈত্র শেষের সেই প্যাচপ্যাচে গরমটা বৈশাখের শুরুতে এক ধাক্কায় উধাও হয়ে গেল। আগরতলার আকাশ জুড়ে সকাল থেকেই কালো মেঘের আনাগোনা। দুপুরের দিকে আচমকাই নামল মুষলধারে বৃষ্টি। GBP Hospital-এর চত্বরটা নিমেষের মধ্যে জলমগ্ন হয়ে পড়েছে। হাসপাতালের ছাদ থেকে জল পড়ার টুপটাপ শব্দ আর বৃষ্টির একটানা একঘেয়ে আওয়াজে চারদিকটা কেমন যেন থমথমে।

ডঃ দীপান্বিতা তখন সবেমাত্র Female Medicine Ward-এর রাউন্ড শেষ করে বেরিয়েছেন। ওনার স্টেথোস্কোপটা পকেটে গোঁজা, চোখে সেই চেনা ডিউটির ক্লান্তি। করিডোরের শেষ মাথায় এসে ওনার চোখ আটকে গেল হাসপাতালের খোলা বারান্দার দিকে। বৃষ্টির ছাঁট থেকে বাঁচতে হাসপাতালের বহু মানুষ সেখানে আশ্রয় নিয়েছে।

ঠিক সেই ভিড়ের এক কোণে, রেলিংয়ে ভর দিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল সাগর।

আজ ওর পরনে একটা হালকা ছাই রঙের ফর্মাল শার্ট। কিন্তু বৃষ্টিটা এত আচমকা আর জোরে এসেছে যে ও সম্পূর্ণ বাঁচতে পারেনি। সাগরের শার্টের হাতা দুটো কনুইয়ের বেশ ওপর পর্যন্ত গোটানো, আর শার্টের কাঁধের অংশটা বৃষ্টিতে ভিজে গায়ের সাথে লেপ্টে আছে। সাগর একহাতে ওর সেই চেনা কালো লেদারের ব্যাগটা বুকের কাছে চেপে ধরে অন্যহাতে বৃষ্টিভেজা আগরতলার আকাশটার দিকে তাকিয়ে ছিল।

দীপান্বিতা যখন আলতো পায়ে ওনার ওপিডি ফাইলের তাড়াটা নিয়ে ওদিক দিয়ে যাচ্ছিলেন, ঠিক তখনই সাগরের ডান হাতের ওপর ওনার চোখটা আটকে গেল। ওনার পা দুটো যেন নিজের অজান্তেই মেঝেতে জমে গেল।

সাগরের ফর্সা, সুগঠিত ডান হাতের পেশিবহুল চামড়ার ওপর নিখুঁত কালো কালিতে আঁকা রয়েছে একটা বিশাল বাজপাখি। ডানা মেলে থাকা একটা ক্রুদ্ধ, স্বাধীন বাজপাখি। শার্টের হাতাটা ওপরে গোটানো থাকায় ট্যাটুটার প্রতিটা ডিটেইলস—বাজপাখির সেই তীক্ষ্ণ চোখ, ডানার পালকের নিখুঁত শেড—সবকিছু একদম স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে। এই কর্পোরেট ফর্মাল পোশাকের আড়ালে এমন একটা বন্য, স্বাধীনচেতা ট্যাটু থাকতে পারে, তা দীপান্বিতার কল্পনার বাইরে ছিল। ওনার মায়াবী চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত বিস্ময় চকমক করে উঠল।

সাগর বোধহয় পাশ থেকে কারও তাকিয়ে থাকাটা অনুভব করতে পেরেছিল। ও ঘাড় ঘোরাতেই দেখতে পেল ডঃ দীপান্বিতা ওনার সেই গভীর মায়াবী চোখ জোড়া নিয়ে ওর হাতের ট্যাটুটার দিকে তাকিয়ে আছেন।

সাগর একটু অপ্রস্তুত হয়ে পড়ল। ও দ্রুত হাতের হাতাটা নামাতে যাচ্ছিল, কিন্তু দীপান্বিতা ততক্ষণে ওনার স্বভাবসুলভ গম্ভীর কিন্তু মিষ্টি গলায় বলে উঠলেন, "ট্যাটুটা খুব সুন্দর তো! কিসের ওটা? ইগল?"

সাগর হাত থামিয়ে দিল। ও একটু মৃদু হাসল—সেই প্রথম দিনের মতো শান্ত, নিরহংকার হাসি। ও মাথা নেড়ে বলল, "না ম্যাম, এটা বাজপাখি। ফ্যালকন।"

দীপান্বিতা একটু এগিয়ে এসে রেলিংয়ের পাশে দাঁড়ালেন। বাইরের বৃষ্টির ঠান্ডা হাওয়াটা ওনাদের মুখে এসে লাগছিল। ওপিডির সেই চেনা ভিড় আর চেঁচামেচি আজ বৃষ্টির শব্দে ঢাকা পড়ে গেছে। দীপান্বিতা কৌতূহলী হয়ে জিজ্ঞেস করলেন, "হঠাৎ বাজপাখি কেন? এমআর-দের প্রফেশনে তো মানুষ সাধারণত একটু সফট বা ফর্মাল কিছু পছন্দ করে। আপনি এত অ্যাগ্রেসিভ একটা পাখি আঁকলেন যে?"

সাগর বাইরের বৃষ্টির দিকে তাকাল। ওর চোখ দুটো কেমন যেন দূরমনস্ক হয়ে গেল, যেন ও এই হাসপাতালের করিডোর ছাড়িয়ে অনেক দূরের কোনো অতীতে চলে গেছে। ও শান্ত গলায় বলল, "বাজপাখি কখনো খাঁচায় বাঁচে না ম্যাম। আর ও যখন একা ওড়ে, তখন আকাশের সবচেয়ে উঁচুতে ওড়ে। ও অন্য কোনো পাখির সাথে দল বেঁধে ওড়ে না। ওর জীবনটা বড্ড একাকী, কিন্তু ওই একাকীত্বেই ওর সবচেয়ে বড় শক্তি।"

একটু থেমে সাগর আবার দীপান্বিতার দিকে তাকাল। ওর চোখে কোনো হীনমন্যতা ছিল না, ছিল নিজের একাকী জীবনযুদ্ধের এক চরম সততা। ও বলল, "আমার জীবনটাও অনেকটা এই বাজপাখির মতোই ম্যাম। আগরতলার এই চেনা ভিড়েও আমি বড্ড একা। নিজের লড়াইটা একাই লড়তে হয়, ডানা ভেঙে গেলেও কাউকে পাশে পাওয়া যায় না। তাই নিজেকে মনে করিয়ে দেওয়ার জন্য এটা এঁকেছিলাম—যতই ঝড় আসুক, ডানা দুটো যেন সচল থাকে।"

সাগরের মুখের এই গভীর জীবনদর্শন শুনে দীপান্বিতা কয়েক সেকেন্ডের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেলেন।

মেডিক্যাল কলেজের চার দেওয়ালে ওনার দিন কাটে। সেখানে কত শত গ্ল্যামারাস ডাক্তার, বড় বড় প্রফেশনালদের ওনার রোজ দেখা হয়। কিন্তু স্রেফ একজন মেডিক্যাল রিপ্রেজেন্টেটিভের মুখে জীবনের এমন নির্মম অথচ সুন্দর ধ্রুবসত্য ওনার কোনোদিন শোনেননি। সাগরের এই একাকী জীবনযুদ্ধের সততা, ওর এই রুক্ষ বাস্তবকে হাসিমুখে মেনে নেওয়ার দর্শনটা দীপান্বিতার মনের গভীরে গিয়ে আঘাত করল।

ওনার মনে হলো, সামনে দাঁড়িয়ে থাকা এই ছেলেটা স্রেফ পাঁচটা সাধারণ এমআর-এর মতো নয়, ও ভিড়ের মাঝেও এক্কেবারে আলাদা। দীপান্বিতার চোখের সেই চেনা গম্ভীর ভাবটা গলে গিয়ে সেখানে এক গভীর শ্রদ্ধা ও এক অচেনা ভালোলাগার আলো জ্বলে উঠল। ওনার বুকের ভেতর কোথাও একটা অচেনা টান প্রথমবার তীব্রভাবে অনুভূত হলো।

সাগর অবশ্য বেশিক্ষণ এই পার্সোনাল স্পেসটা ধরে রাখল না। বৃষ্টিটা একটু কমতেই ও নিজের ব্যাগটা কাঁধে তুলে নিল। অত্যন্ত ফর্মাল দূরত্ব বজায় রেখে মাথা ঝুঁকিয়ে বলল, "আজ আসি ম্যাম। ডিউটি আছে। ভালো থাকবেন।"

সাগর করিডোর দিয়ে বৃষ্টির মধ্যেই হেঁটে বেরিয়ে গেল। ডঃ দীপান্বিতা ওখানেই দাঁড়িয়ে রইলেন। ওনার চোখের মণি দুটো তখন করিডোরের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত সাগরের ওই ছাই রঙের শার্ট আর ওনার মনের ভেতর ডানা মেলা সেই 'বাজপাখি'টার দিকেই তাকিয়ে রইল।

********************

বৃষ্টির সেই দুপুরের পর ক্যালেন্ডারের পাতা আরও খানিকটা এগিয়ে গেল। আগরতলার চেনা রুটিন—আইজিএম চৌমুহনী থেকে শুরু করে জিবিপি হাসপাতালের ওপিডি করিডোর—সবকিছুই নিজের নিয়মে চলছিল। কিন্তু এই চেনা নিয়মের আড়ালে দুটো মানুষের চেনা জগৎটা কেমন যেন একটু একটু করে বদলে যাচ্ছিল।

পরের দু-তিন সপ্তাহে হাসপাতালের ওপিডি আর প্রাইভেট চেম্বারের বাইরে আরও তিন-চারবার দেখা হয়ে গেল ওদের। প্রতিটা দেখাই ছিল ভীষণ সংক্ষিপ্ত আর পুরোপুরি প্রফেশনাল। সাগর অন্যান্য এমআর-দের ভিড়ে ফাইল হাতে দাঁড়িয়ে থাকত, আর দীপান্বিতা ওনার চেনা গম্ভীর ডাক্তারী চালে করিডোর দিয়ে হেঁটে যেতেন। কিন্তু এখন আর সেই প্রথম দিনের মতো অচেনা দূরত্বটা ছিল না। দীপান্বিতা ওনার চেনা ভিড় ঠেলে যাওয়ার সময় সাগরের দিকে তাকিয়ে আলতো করে একটু হাসতেন, আর সাগরও অত্যন্ত ভদ্রতার সাথে মাথা ঝুঁকিয়ে সেই হাসির উত্তর দিত।

কিন্তু বদলটা ঘটছিল সাগরের ভেতরে।

দীপান্বিতার ওই একজোড়া চোখ... ওপিডির শত ব্যস্ততা আর ক্লান্তির মাঝেও ওই চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত মায়াবী টান ছিল। সাগর যতবার ওনার চেম্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে দীপান্বিতার ওই চোখের দিকে তাকাত, ততবার ওর বুকের ভেতরটা কেমন যেন ওলটপালট হয়ে যেত। তিন-চারটে ভিজিটের পর সাগর বুঝতে পারল, ও নিজের অজান্তেই এক গভীর আকর্ষণের খাঁচায় বন্দি হয়ে পড়ছে। ও জাস্ট একজন অর্ডিনারি এমআর, আর দীপান্বিতা একজন স্বনামধন্য সরকারি ডাক্তার—এই সামাজিক দেওয়ালটা সাগর খুব ভালো করেই জানত। তাই ও নিজের এই ভালোলাগা, এই তীব্র আকর্ষণকে বুকের একদম গভীরে চেপে রাখল। ওনার সামনে গেলে নিজের প্রফেশনাল দূরত্বটা ও আরও বেশি শক্ত করে ধরে রাখত, যাতে ওর চোখের এক ফোঁটা দুর্বলতাও ম্যামের সামনে প্রকাশ না পেয়ে যায়।

ঠিক এইরকম একটা সময়েই ভাগ্য ওদের দুজনকে আরেকটু কাছে টেনে আনল।

সেদিন শনিবার, জিবিপি হাসপাতালের সেমিনার রুমের বাইরে তখন বেশ ভিড়। একটা বিশেষ মেডিক্যাল জার্নালের নতুন কার্ডিওলজি লিটারেচার আর ড্রাগ ট্রায়ালের ডেটা নিয়ে ডাক্তারদের মধ্যে আলোচনা চলছিল। দীপান্বিতা ওনার একটা প্রেজেন্টেশনের জন্য ওই জার্নালের স্পেসিফিক কিছু ইন্ডিয়ান ডেটা খুঁজছিলেন, যা সচরাচর নেটে পাওয়া যাচ্ছিল না। কাকতালীয়ভাবে, সাগরের কোম্পানিই এই নতুন ড্রাগ ট্রায়ালের অফিশিয়াল স্পনসর ছিল।

চেম্বারের বাইরে সাগরকে একা দাঁড়িয়ে থাকতে দেখে দীপান্বিতা নিজেই ওনার ওপিডি ফাইলটা হাতে নিয়ে এগিয়ে এলেন। ওনার চোখের সেই মায়াবী চাউনিটা আজ একটু বেশিই উজ্জ্বল লাগছিল।

"শুনুন, সাগর না?" দীপান্বিতা ওনার মিষ্টি অথচ স্পষ্ট গলায় ডাকলেন।

সাগর চমকে উঠে সোজা হয়ে দাঁড়াল। "হ্যাঁ ম্যাম, বলুন। কোনো অসুবিধা?"

"অসুবিধা নয়, আসলে একটা হেল্প লাগত।" দীপান্বিতা একটু ইতস্তত করে বললেন, "আপনাদের কোম্পানির ওই নতুন কার্ডিও-ড্রাগের যে গ্লোবাল আর ইন্ডিয়ান ট্রায়াল ডেটাটা লঞ্চ হয়েছে, ওটার অরিজিনাল লিটারেচার জার্নালটা আমার খুব দরকার ছিল। আমার আগামী সপ্তাহের প্রেজেন্টেশনের জন্য। ওটা কি অ্যারেঞ্জ করা যাবে?"

সাগর প্রফেশনাল খাতিরে চটপট মাথা নাড়ল, "হ্যাঁ ম্যাম, নিশ্চয়ই যাবে। আমাদের অফিশিয়াল পোর্টালে ওটার পিডিএফ কপি আছে। আমি কালকের মধ্যেই ওটা হেড অফিস থেকে আনিয়ে আপনাকে প্রোভাইড করতে পারব।"

"পিডিএফ হলেই খুব ভালো হয়।" দীপান্বিতা ওনার অ্যাপ্রনের পকেট থেকে নিজের পার্সোনাল ফোনটা বের করলেন। স্ক্রিনটা আনলক করে সাগরের দিকে বাড়িয়ে দিয়ে বললেন, "তাহলে একটা কাজ করুন, আপনার নম্বরটা একটু বলুন। আমি সেভ করে নিচ্ছি। আপনি আমাকে হোয়াটসঅ্যাপে ফাইলটা একটু ড্রপ করে দেবেন।"

সাগরের বুকের ভেতরটা তখন যেন একটা চেনা ছন্দ হারিয়ে ফেলল। একজন সরকারি ডাক্তার নিজে থেকে ওনার পার্সোনাল নম্বরটা ওর মতো একজন এমআর-এর দিকে এগিয়ে দিচ্ছেন—এটা ও ভাবতেও পারেনি। ওনার সেই মায়াবী চোখ দুটো তখন সাগরের চোখের দিকেই স্থির হয়ে আছে।

সাগর নিজের ভেতরের এই সুনামিটাকে বাইরে প্রকাশ পেতে দিল না। ও অত্যন্ত ফর্মাল দূরত্ব বজায় রেখে, একদম শান্ত গলায় নিজের ১০ ডিজিটের নম্বরটা বলল। দীপান্বিতা স্ক্রিনে টাইপ করে নামটা সেভ করলেন—"Sagar MR"

নম্বরটা সেভ করে দীপান্বিতা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়েই আলতো করে একটু হাসলেন। তারপর সাগরের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "থ্যাঙ্ক ইউ সাগর। আমি টেক্সট করে রাখব, ফাইলটা পেলে প্লিজ পাঠিয়ে দেবেন।"

"নিশ্চয়ই ম্যাম। গুড ডে।" সাগর প্রফেশনাল দূরত্বটা বজায় রেখে একটা হালকা ডিস্টেন্স মেইনটেইন করেই দাঁড়িয়ে রইল, যাতে কোনোভাবেই ওনার পার্সোনাল স্পেসে ও আঘাত না করে।

দীপান্বিতা ওনার ওপিডি ফাইলের তাড়াটা বুকে চেপে ধরে ওনার কেবিনের দিকে হেঁটে চলে গেলেন। আর সাগর ওখানেই স্তব্ধ হয়ে দাঁড়িয়ে রইল। ওর ফোনের স্ক্রিনে তখনও কোনো মেসেজ আসেনি, কিন্তু ওর মনে হচ্ছিল—দীপান্বিতার ওই মায়াবী চোখের মায়া আর এই ১০টা সংখ্যার নম্বরটা ওর জীবনে এক অদ্ভুত, অজানা ঝড় নিয়ে আসতে চলেছে। ও নিজের ভালোলাগাকে মনে চেপে রাখার দেওয়ালটা আরও একটু শক্ত করার চেষ্টা করল, কিন্তু অবচেতন মন ততক্ষণে ওনার ওই একজোড়া চোখের মায়ায় পুরোপুরি আটকে গেছে।


*********************

Please continue in CHAPTER 02

********************


📢 পাঠকদের উদ্দেশ্যে

গল্পটি পড়ে আপনার কেমন লাগল, তা অবশ্যই নিচের কমেন্ট বক্সে জানাবেন। আপনার মতামত, পরামর্শ এবং সমালোচনা আমাদের আরও ভালো গল্প উপহার দিতে অনুপ্রাণিত করে। গল্পটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন, যাতে আরও বাংলা গল্পপ্রেমীরা এটি পড়ার সুযোগ পান। আপনার একটি শেয়ার এবং একটি মন্তব্য আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। ❤️


``` Tanmoy Roy

Tanmoy Roy

Bengali Author • Storyteller • Founder & Lead Author of CHOLO GOLPO SUNI

```

Tanmoy Roy is a Bengali author, storyteller, and founder of CHOLO GOLPO SUNI. He writes original Bengali fiction across mystery, thriller, horror, adventure and emotional drama. His stories focus on suspense, realism, emotion and memorable characters, creating immersive reading experiences for Bengali readers worldwide.

📚 Genres:
Mystery • Thriller • Horror • Adventure • Emotional Drama • Bengali Fiction
Connect With The Author 👇

© Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI | Bengali Mystery, Thriller, Horror & Original Fiction

Comments