তুমি ডানা মেলো | Tumi Dana Melo | Chapter 02 | A tragic love story of a medical representative and a doctor by Tanmoy Roy | Cholo Golpo Suni

********************

PLEASE READ CHAPTER 01 FIRST

********************

পরের দিন রবিবার। আগরতলার রামনগরের নিজের ছোট্ট ভাড়া ঘরের টেবিলে বসে সাগর ল্যাপটপটা অন করল। হেড অফিস থেকে ও আগের রাতেই স্পেসিফিক সেই কার্ডিওলজি জার্নালের অফিশিয়াল ইন্ডিয়ান ট্রায়াল ডেটার পিডিএফ-টা আনিয়ে রেখেছিল। ফাইলটা রেডি করে ও নিজের ফোনটা হাতে নিল। নম্বরটা সেভ করা ছিল—"Dr. Dipannita AGMC"।

এক মুহূর্তের জন্য সাগরের আঙুলটা স্ক্রিনের ওপর থমকে গেল। বুকের ভেতরটা কেমন যেন একটু কেঁপে উঠল। স্রেফ একটা প্রফেশনাল ফাইল পাঠানো, তাও কেন যেন মনে হচ্ছিল ও কোনো এক নিষিদ্ধ সীমানায় পা রাখছে। একটা গভীর শ্বাস নিয়ে ও পিডিএফ ফাইলটা সিলেক্ট করে সেন্ড করে দিল। নিচে স্রেফ দুটো ফর্মাল শব্দ লিখে দিল—"Respected Madam, As requested, please find the attached Medical Journal PDF. Regards, Sagar."

ফাইলটা যাওয়ার ঠিক মিনিট দশেকের মাথায় ওপাশে দুটো ব্লু-টিক পড়ল। আর তার পরক্ষণেই চ্যাটবক্সে ভেসে উঠল একটা সংক্ষিপ্ত উত্তর—"Thank you so much, Sagar. This will help a lot." সাগর আর কোনো রিপ্লাই দিল না। ও নিজের সীমানাটা খুব ভালো করেই জানত। ফোনটা লক করে ও অফিসের উইকলি রিপোর্টিংয়ের কাজে মন দিল।

এর ঠিক দিন চারেক পরের ঘটনা। সাগরের কঠোর পরিশ্রম আর দিনরাতের একাকী জীবনযুদ্ধের একটা বড় স্বীকৃতি এল। কোয়ার্টারলি পারফরম্যান্সের ওপর বেস করে সাগরের কোম্পানি ওকে পুরো ত্রিপুরার "Best Medical Representative"-এর ট্রফিতে সম্মানিত করল। আগরতলার একটা নামী হোটেলে সন্ধের অনুষ্ঠানে যখন ওর হাতে সেই ভারী চকচকে কাঁচের ট্রফিটা তুলে দেওয়া হলো, সাগরের মনে হলো ওর এই একাকী বাজপাখির ডানা দুটো যেন সত্যিই একটুখানি আকাশ ছুঁতে পেরেছে।

রাতে ঘরে ফিরে ক্লান্ত সাগর ট্রফিটা টেবিলের ওপর রাখল। জীবনের এই বড় আনন্দের মুহূর্তেও ওর পাশে বসে খুশি হওয়ার মতো কোনো স্পেশাল মানুষ ছিল না। এক অদ্ভুত একাকীত্ব ও চেনা হাহাকার মনটাকে গ্রাস করতে চাইল। নিজের অজান্তেই ও ট্রফিটার একটা ছবি তুলে নিজের হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাসে আপলোড করে দিল। কোনো ক্যাপশন দিল না, স্রেফ একটা চিলতে স্মাইলি ইমোজি।

ওদিকে ঘড়িতে তখন রাত সাড়ে এগারোটা। GBP Hospital-এর ক্যাজুয়ালটি ওয়ার্ডে এক টানা ডিউটি শেষ করে নিজের সরকারি কোয়ার্টারের বিছানায় এসে বসেছিলেন দীপান্বিতা। শাড়ির আঁচলটা আলগা করে, ক্লান্ত হাত দুটো একটু এলিয়ে দিয়ে ও নিজের ফোনটা হাতে নিলেন। অবচেতনভাবেই ওনার আঙুলগুলো হোয়াটসঅ্যাপের স্ট্যাটাস বারের দিকে এগিয়ে গেল। স্ক্রোল করতে করতে হঠাৎ ওনার চোখ আটকে গেল সাগরের স্ট্যাটাসে।

টেবিলের ওপর রাখা একটা সুন্দর গ্ল্যামারাস ট্রফি। কোনো দেখনদারি নেই, কোনো অহংকার নেই। ছবিটার দিকে তাকিয়ে দীপান্বিতার ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত, পরম শান্তির হাসি ফুটে উঠল। ওনার মনে পড়ে গেল সেই বৃষ্টির দিনের কথা—"ডানা ভেঙে গেলেও কাউকে পাশে পাওয়া যায় না... যতই ঝড় আসুক, ডানা দুটো যেন সচল থাকে।" দীপান্বিতা ফোনের স্ক্রিনের দিকে তাকিয়ে মনে মনে বললেন, 'তোমার ডানা সত্যিই সচল আছে, সাগর।' ওনার বুকের ভেতরটা এক চেনা উষ্ণতায় ভরে উঠল।

পরের দিন সকাল। হাসপাতালের করিডোর যথারীতি ব্যস্ত। সাগর অন্য এমআর-দের সাথে এক কোণে দাঁড়িয়ে ছিল। দীপান্বিতা দূর থেকে হেঁটে আসছিলেন। ওনার পরনে একটা অফ-হোয়াইট সুতির শাড়ি, কাঁধে স্টেথোস্কোপ। সাগরের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় দীপান্বিতা হঠাৎ নিজের চেনা গম্ভীর ডাক্তারী চালটা থামিয়ে দিলেন। ওনার সেই গভীর, মায়াবী চোখ দুটো সরাসরি সাগরের চোখের ওপর স্থির হলো।

"কংগ্রাচুলেশনস, সাগর!" দীপান্বিতা ওনার মাস্কটা হালকা নামিয়ে অত্যন্ত মিষ্টি কিন্তু মন থেকে বললেন।

সাগর একটু থতমত খেয়ে গেল, "ম্যাম?"

"কাল রাতে আপনার স্ট্যাটাসটা দেখলাম। বেস্ট এমআর ট্রফি পেয়েছেন। খুব ভালো লাগল দেখে। খুব ফর্মালি জানাচ্ছি না, কিন্তু রিয়েলি... ইউ ডিজার্ভ ইট।" দীপান্বিতা ওনার মায়াবী চোখের সমস্ত ওম উজার করে দিয়ে সাগরের দিকে তাকিয়ে হাসলেন।

সাগরের বুকের ভেতর যেন হাজারটা ড্রাম একসাথে বেজে উঠল। ও কোনোমতে নিজেকে সামলে মাথা নিচু করে বলল, "থ্যাঙ্ক ইউ সো মাচ, ম্যাম। আপনার এই উইশটা আমার কাছে অনেক বড় পাওনা।"

দীপান্বিতা সাগরের ওই অপ্রস্তুত, সরল মুখটার দিকে আরও কয়েক সেকেন্ড তাকিয়ে রইলেন। সাগরের এই সততা, ট্রফি পাওয়ার পরেও ওর এই ডাউন-টু-আর্থ স্বভাবটা দেখে দীপান্বিতার মনের ভেতর এক অদ্ভুত ওলটপালট হয়ে গেল। ওনার মনে হলো, এই ছেলেটা কোনো এক জাদুবলে ওনার সমস্ত ডাক্তারী স্ট্যাটাস, ইগো আর সামাজিক দেয়ালগুলোকে এক লহমায় ধুলোয় মিশিয়ে দিয়েছে।

করিডোর দিয়ে নিজের চেম্বারের দিকে পা বাড়ানোর সময় দীপান্বিতা নিজের অবচেতন মনেই হাতটা বুকের ওপর রাখলেন। ওনার হার্টবিট তখন স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক দ্রুত চলছে। নিজের কেবিনে ঢুকে চেয়ারে বসার পর ওনার নিজের ওপরই হাসি পেল। ডঃ দীপান্বিতা আজ খুব পরিষ্কারভাবে বুঝতে পারলেন যে, হাসপাতালের এই চেনা ভিড়ে, একটা সাধারণ এমআর-এর শান্ত চোখের সরলতার কাছে উনি নিজের মনটা পুরোপুরি হারিয়ে ফেলেছেন। দীপান্বিতার মনে এক অমোঘ, গভীর প্রেমের জন্ম হয়ে গেছে।

 ********************

হাসপাতালের চেনা চার দেওয়ালে দিনগুলো মাপা ছন্দে কাটছিল। কিন্তু দীপান্বিতার মনের ভেতরের ঝড়টা দিনে দিনে আরও তীব্র হচ্ছিল। নিজের কেবিনে বসে যখনই ও কোনো প্রেসক্রিপশন লিখত, কিংবা ওপিডি করিডোর দিয়ে হেঁটে যেত—ওনার চোখ দুটো অবচেতনভাবেই একটা ছাই রঙা শার্ট আর কাঁধে লেদার ব্যাগ ঝোলানো শান্ত ছেলেটাকে খুঁজত। দীপান্বিতা বুঝতে পারছিলেন, এই গোপন ভালোলাগাটা এখন আর স্রেফ মনের কোণে চেপে রাখার মতো অবস্থায় নেই। এটার একটা পরিণতি দরকার।

সেদিন দুপুর একটা। হাসপাতালের চেনা ব্যস্ততা একটু থিতু হয়েছে। সাগর hospital canteen-এর এক কোণে একটা প্লাস্টিকের চেয়ারে বসে প্লাস্টিকের কাপে চা খাচ্ছিল। সকাল থেকে চারটে ওপিডি ভিজিট শেষ করে ওর শরীরটা বেশ ক্লান্ত। ঠিক তখনই ওর ফোনের স্ক্রিনটা জ্বলে উঠল। হোয়াটসঅ্যাপে একটা ছোট মেসেজ—"সাগর, ওপিডি শেষ করে একবার ক্যান্টিনের পেছনের বারান্দাটায় আসতে পারবেন? একটা দরকার ছিল। — ডঃ দীপান্বিতা।"

সাগর চায়ের কাপটা টেবিল রাখল। বুকের ভেতরটা হঠাৎ এক চেনা আশঙ্কায় দুলতে শুরু করল। ও চটপট ব্যাগটা গুছিয়ে ক্যান্টিনের পেছনের ফাকা করিডোরটায় গিয়ে দাঁড়াল। কিছুক্ষণের মধ্যেই দীপান্বিতা এলেন। আজ ওনার পরনে কোনো অ্যাপ্রন ছিল না, স্রেফ একটা হালকা বেগুনি রঙের সুতির শাড়ি। ওনার মায়াবী চোখ দুটোতে এক অদ্ভুত অস্থিরতা।

"ম্যাম, কোনো দরকার ছিল?" সাগর জিজ্ঞেস করল।

দীপান্বিতা একটু ইতস্তত করে চারপাশটা দেখে নিলেন। তারপর সাগরের চোখের দিকে তাকিয়ে বললেন, "সাগর, আমার আগরতলার একটা shopping mall-এ একটা পার্সোনাল কাজ আছে। মানে একটা জিনিস কিনতে হবে, কিন্তু একা যেতে ইচ্ছে করছে না। আপনি কি আজ বিকেল পাঁচটায় ওখানকার ফোয়ারার সামনে একটু আসতে পারবেন? যদি আপনার ডিউটির কোনো প্রবলেম না হয়..."

ডাক্তার madam- র মুখে এমন একটা আবদার শুনে সাগর অবাক না হয়ে পারল না। কিন্তু ওনার ওই মায়াবী চোখের দিকে তাকিয়ে ও 'না' বলতে পারল না। মাথা ঝুঁকিয়ে শান্ত গলায় বলল, "ঠিক আছে ম্যাম, আমার বিকেল চারটের মধ্যে ফিল্ডের কাজ শেষ হয়ে যাবে। আমি পাঁচটায় চলে আসব।"

বিকেল ঠিক পাঁচটা। আগরতলার সেই নামী শপিং মলের ভেতরে তখন উইকেন্ডের উপচে পড়া ভিড়। চারদিকে নিয়ন আলোর ঝলকানি, শোরুমগুলোর কাঁচের দেওয়ালে গ্ল্যামারের ছোঁয়া, আর এসির ঠান্ডা হাওয়া। মল-এর সেন্ট্রাল ফোয়ারার সামনে দাঁড়িয়ে সাগর অপেক্ষা করছিল। ঠিক তখনই ভিড় ঠেলে দীপান্বিতা এগিয়ে এলেন। ওনার পরনে একটা কালো কুর্তি, চুলে কোনো ক্লিপ নেই—খোলা চুলগুলো কাঁধের ওপর এসে পড়েছে। হাসপাতালের সেই গম্ভীর ডক্টর দীপান্বিতাকে আজ এক্কেবারে সাধারণ, চেনা এক মেয়ের মতো লাগছিল।

"অনেকক্ষণ অপেক্ষা করছেন?" দীপান্বিতা এসে মৃদু হেসে জিজ্ঞেস করলেন।

"না ম্যাম, এই জাস্ট এলাম।" সাগর বিনীতভাবে বলল।

ওরা দুজনে মলের দোতলার একটা ফাঁকা বারান্দার দিকে হেঁটে গেল, যেখান থেকে পুরো মলের ভিড়টা নিচে দেখা যায়। চারদিকের চ্যাঁচামেচি আর মলের চেনা মিউজিকের মাঝেও ওদের দুজনের মধ্যে এক অদ্ভুত নীরবতা কাজ করছিল।

হঠাৎ দীপান্বিতা হাঁটা থামিয়ে দিলেন। ওনার হাত দুটো রেলিংয়ের ওপর শক্ত করে চেপে বসলেন। ওনার মায়াবী চোখ দুটো তখন সাগরের শান্ত চোখের ওপর স্থির। দীপান্বিতার বুকটা তখন দ্রুত ওঠানামা করছে। ওনার মনে হলো, আজ যদি ও না বলে, তবে সারা জীবন ও নিজের কাছে অপরাধী হয়ে থাকবে।

"সাগর..." দীপান্বিতার গলাটা একটু কেঁপে উঠল।

"বলুন ম্যাম।" সাগর একটু অবাক হয়ে ওনার দিকে তাকাল।

"আমি আজ এখানে কোনো জিনিস কিনতে আসিনি। তোমাকে একটা কথা বলতে এসেছি, যা না বললে আমি আর শান্তিতে ডিউটি করতে পারছি না।" দীপান্বিতা একটা গভীর শ্বাস নিলেন। ওনার চোখের সমস্ত আড়াল, ওনার ডাক্তারী স্ট্যাটাস, ওনার সোশ্যাল স্টিগমা, ওনার পরিবারের ইগো—সবকিছুকে এক নিমেষে একপাশে সরিয়ে রেখে ওনার চোখ দিয়ে যেন এক পবিত্র আলোর ধারা বেরিয়ে এলো।

ওনার কাঁপা হাতটা আলতো করে সাগরের হাতের ওপর রাখলেন। "সাগর, আমি জানি না তুমি কী ভাববে। আমি একজন ডাক্তার, সরকারি চাকরি করি—সমাজ হয়তো অনেক কিছু দেখবে। কিন্তু আমি যখন নিজের আয়নার সামনে দাঁড়াই, আমি স্রেফ একটা মেয়ে। আর সেই মেয়েটা প্রতিদিন, প্রতিটা মুহূর্তে তোমার ওই শান্ত চোখের সরলতাটাকে ভালোবেসে ফেলেছে। সাগর, আই অ্যাম ইন লাভ উইথ ইউ। আমি তোমাকে একজন এমআর হিসেবে দেখিনি, স্রেফ একজন খাঁটি মানুষ হিসেবে ভালোবেসেছি। তুমি কি আমার সাথে নিজের জীবনটা ভাগ করে নেবে?"

মলের সেই চেনা ভিড়ের মাঝে দাঁড়িয়ে দীপান্বিতার এই অকল্পনীয়, নিষ্পাপ কনফেশন শুনে সাগরের পায়ের তলার মাটি যেন এক সেকেন্ডে সরে গেল। সাগরের বুকের ভেতরটা তীব্রভাবে কাঁপতে শুরু করল। ও যে মেয়েটাকে অবচেতন মনে নিজের অজান্তেই দেবীর মতো ভালোবেসে ফেলেছে, সে আজ নিজের সব আভিজাত্য বিসর্জন দিয়ে ওর হাতটা ধরেছে! সাগরের ইচ্ছে করছিল দীপান্বিতার হাতটা শক্ত করে ধরে বলতে—'আমিও আপনাকে ভালোবাসি ম্যাম।'

কিন্তু ঠিক সেই মুহূর্তেই সাগরের মগজে এসে ধাক্কা মারল এক নিষ্ঠুর বাস্তব।

সমাজের বাঁকা চোখ, ও একজন সাধারণ বাইক চালানো এমআর যে রোদে-জলে খেটে ওষুধ বিক্রি করে, আর দীপান্বিতা একজন ক্লাস-ওয়ান গ্যাজেটেড অফিসার। এই অসম সম্পর্কের পরিণতি সমাজ কোনোদিন মেনে নেবে না। দীপান্বিতার বাবা-মা, হাসপাতালের অন্য ডাক্তাররা ওকে ছিছি করবে। দীপান্বিতার ক্যারিয়ার নষ্ট হয়ে যাবে। সাগরের ভেতরের মধ্যবিত্ত হীনমন্যতা আর তীব্র সামাজিক ভয় এক মুহূর্তে ওকে গ্রাস করে নিল।

সাগর অত্যন্ত কষ্টের সাথে, নিজের ভেতরের কাঁপনটাকে চেপে রেখে আলতো করে দীপান্বিতার হাত থেকে নিজের হাতটা সরিয়ে নিল। ওর নিজের চোখ দুটো তখন কান্নায় ভারী হয়ে উঠেছে, কিন্তু ও মুখে এক নিষ্ঠুর অবহেলা ফুটিয়ে তোলার চেষ্টা করল।

তীব্র ইতস্তত বোধ আর দ্বিধা (Hesitation) নিয়ে সাগর মাথা নিচু করে বলল, "ভুল করছেন ম্যাম। আপনি আবেগের বশে একটা ভুল সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আপনার স্ট্যাটাস আর আমার স্ট্যাটাস এক নয়। সমাজ এই সম্পর্ককে থুথু দেবে। আমি একজন সামান্য MR ম্যাম, আপনার এই বড় বড় ডাক্তারদের সমাজে আমার কোনো জায়গা নেই। দয়া করে এই পাগলামিটা বন্ধ করুন। আমি আপনার এই প্রোপোজালটা অ্যাকসেপ্ট করতে পারব না। আমাকে ক্ষমা করবেন।"

কথা কটা বলেই সাগর আর এক সেকেন্ডও দীপান্বিতার চোখের দিকে তাকানোর সাহস পেল না। ও জানে, ও তাকালে আর নিজেকে ধরে রাখতে পারবে না। ও নিজের লেদারের ব্যাগটা শক্ত করে আঁকড়ে ধরে, মলের চেনা ভিড়ের মাঝে তীব্র গতিতে হেঁটে বেরিয়ে গেল।

দোতলার সেই রেলিং ধরে একাই দাঁড়িয়ে রইলেন ডঃ দীপান্বিতা। চারদিকের মলের নিয়ন আলো আর চেনা ভিড়ের মাঝে ওনার চোখ থেকে দুটো ফোঁটা জল গাল বেয়ে নিচে গড়িয়ে পড়ল। ওনার সেই মায়াবী চোখ দুটো আজ প্রথমবার এক তীব্র রিজেকশন আর অভিমানে পাথর হয়ে গেল।

****************

রিজেকশনের সেই অভিশপ্ত বিকেলটার পর আগরতলার চেনা চাদরটা হঠাৎ করেই যেন বদলে গেল। মল-এর সেই নিয়ন আলোর ভিড়ে দীপান্বিতার জলভরা চোখ দুটোকে ফেলে রেখে সাগর সেদিন পালিয়ে এসেছিল ঠিকই, কিন্তু ও নিজের ভেতরের অনুশোচনা আর হাহাকার থেকে পালাতে পারেনি। রামনগরের বন্ধ ঘরে রাতে যখন ও একা শুয়ে থাকত, ফ্যানের একঘেয়ে আওয়াজের মাঝেও ওর কানে শুধু দীপান্বিতার ওই একটা কথাই প্রতিধ্বনিত হতো—"তুমি কি আমার সাথে নিজের জীবনটা ভাগ করে নেবে?" ও নিজে হাতটা সরিয়ে নিয়েছে, কিন্তু ওর অবচেতন মন আজও ওনার ওই একটা হাতের ছোঁয়া পাওয়ার জন্য ছটফট করত।

কিন্তু হাসপাতালের রূঢ় বাস্তবটা ছিল আরও অনেক বেশি কঠিন।

পরের দিন থেকেই ওদের সম্পর্কের সমীকরণটা এক ধাক্কায় এক্কেবারে বরফের মতো শীতল হয়ে গেল। কথা যে পুরোপুরি বন্ধ হয়েছিল, তা নয়। কিন্তু সেই কথাবার্তার ধরন এখন আর আগের মতো ছিল না। সেটা এখন হয়ে উঠেছিল একদম মেপে মেপে শুধু purely professional।

ওপিডির করিডোরে বা চেম্বারের বাইরে যখনই ওদের দেখা হতো, দীপান্বিতা আর আগের মতো নিজের মাস্কটা নামিয়ে ওনার ওই গভীর, মায়াবী চোখের সমস্ত ওম উজার করে দিয়ে সাগরের দিকে তাকিয়ে হাসতেন না। এমন একটা বড় রিজেকশন দীপান্বিতার মতো একজন আত্মবিশ্বাসী ও আত্মমর্যাদাসম্পন্ন মেয়েকে ভেতর থেকে গভীরভাবে হার্ট করেছিল। ওনার চোখের সেই চেনা উষ্ণতা আর মায়া এখন একটা ঘন, শীতল অভিমানে ঢেকে গিয়েছিল।

সাগর ফাইল হাতে ওনার চেম্বারে ঢুকলে দীপান্বিতা স্রেফ একজন পেশাদারের মতো ফাইলের দিকে তাকিয়ে ওষুধের কম্পোজিশন শুনতেন, প্রেসক্রিপশন প্যাডে নোট নিতেন, আর অত্যন্ত যান্ত্রিক গলায় বলতেন, "ঠিক আছে সাগর, লিটারেচারটা রেখে যান। আমি দেখে নেব। নেক্সট পেশেন্টকে একটু ডেকে দিন।"

ওনার এই অতিরিক্ত পেশাদারিত্ব আর চোখের ওই শীতল অভিমান সাগরের বুকে প্রতিদিন তিরের মতো গিয়ে বিঁধত। সাগর বুঝতে পারছিল, ও শুধু দীপান্বিতার প্রোপোজালটাই ফিরিয়ে দেয়নি, ও ওনার চোখের সেই মায়াবী আলোটাকেও চিরতরে নিভিয়ে দিয়েছে। ও চেয়েছিল প্রফেশনাল দূরত্ব বজায় রাখতে, কিন্তু এখন এই অতিরিক্ত ফর্মাল কথাবার্তা আর আগের চেয়ে অনেক কম যোগাযোগ ও খোদ সাগরের দম আটকে দিচ্ছিল।

একদিন দুপুরবেলা, AGMC-র ওপিডি করিডোরে যখন প্রচণ্ড ভিড়, সাগর একটা প্রেসক্রিপশন ইনকোয়ারির জন্য ওনার চেম্বারের বাইরে দাঁড়িয়ে ছিল। দীপান্বিতা ভেতর থেকে এক পেশেন্টের হাত ধরে করিডোরে এলেন ওনার অন্য এক কলিগকে রেফার করার জন্য। যাওয়ার পথে সাগরের সাথে ওনার কাঁধের খুব সামান্য একটু ছোঁয়া লাগল। সাগর এক মুহূর্তের জন্য থমকে দাঁড়িয়ে ওনার চোখের দিকে তাকাল।

দীপান্বিতার চোখ জোড়া আজ বড্ড বেশি শূন্য লাগছিল। ওনার ওই মায়াবী চোখে এখন আর কোনো অধিকারবোধ নেই, কোনো চেনা টান নেই; আছে শুধু এক আকাশ নীরব চোট আর গোপন অভিমান। ওনার এই চোখের হাহাকার দেখে সাগরের ইচ্ছে করছিল সবার সামনে ওনার হাতটা ধরে চিৎকার করে বলতে—'আমি পরিস্থিতির জন্য নিরুপায় ম্যাম, আমি বাধ্য!'

কিন্তু ও পারল না। ও নিজের লেদারের ব্যাগটা আরও শক্ত করে চেপে ধরে করিডোরের দেয়ালের সাথে মিশে দাঁড়িয়ে রইল। দীপান্বিতা ওনার পাশ দিয়ে এক হাত দূরত্ব বজায় রেখে স্রেফ একজন অপরিচিত মানুষের মতো হেঁটে চলে গেলেন। চৈত্র শেষের সেই শুকনো বাতাসটা যেন ওদের দুজনের মাঝখানের এই নীরব দূরত্বটাকে আরও একটু বাড়িয়ে দিয়ে গেল। 


Chapter 02 ends...


********************

PLEASE CONTINUE CHAPTER 03

********************


📢 পাঠকদের উদ্দেশ্যে

গল্পটি পড়ে আপনার কেমন লাগল, তা অবশ্যই নিচের কমেন্ট বক্সে জানাবেন। আপনার মতামত, পরামর্শ এবং সমালোচনা আমাদের আরও ভালো গল্প উপহার দিতে অনুপ্রাণিত করে। গল্পটি ভালো লেগে থাকলে বন্ধু ও পরিবারের সঙ্গে শেয়ার করুন, যাতে আরও বাংলা গল্পপ্রেমীরা এটি পড়ার সুযোগ পান। আপনার একটি শেয়ার এবং একটি মন্তব্য আমাদের জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা। ❤️


``` Tanmoy Roy

Tanmoy Roy

Bengali Author • Storyteller • Founder & Lead Author of CHOLO GOLPO SUNI

```

Tanmoy Roy is a Bengali author, storyteller, and founder of CHOLO GOLPO SUNI. He writes original Bengali fiction across mystery, thriller, horror, adventure and emotional drama. His stories focus on suspense, realism, emotion and memorable characters, creating immersive reading experiences for Bengali readers worldwide.

📚 Genres:
Mystery • Thriller • Horror • Adventure • Emotional Drama • Bengali Fiction
Connect With The Author 👇

© Tanmoy Roy | CHOLO GOLPO SUNI | Bengali Mystery, Thriller, Horror & Original Fiction

Comments